‘কিন্তু পশুটা ঘরের মধ্যেই ছিল, তা কে জানত…’

0
232
আবদুস সালাম ও সানজিদা

‘আমার বড় মেয়ে স্কুল-কলেজ শেষ করে আইন বিষয়ে পড়ছে। ও যখন বাইরে যায় তখন ভয় লাগে, কখন কী হয় কে জানে। আর মাত্র ৬ বছর বয়সী মেয়েকে ওর মা স্কুলে নিয়ে যায়। স্কুলের সময় ওর মা স্কুলেই বসে থাকে। তারপর বাসায় ফেরে। তাই তাকে নিয়ে তো চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু পশুটা ঘরের মধ্যেই ছিল, তা কে জানত, বাসার মধ্যেই আমার মেয়েটাকে মেরে ফেলল।’

বলছিলেন সামিয়া আফরিন সায়মার বাবা আবদুস সালাম। গত শুক্রবার সন্ধ্যার পর সামিয়াকে ধর্ষণের পর শ্বাস রোধ করে হত্যা করা হয়। আর ঘটনাটি ঘটে সামিয়াদের ভবনেরই একটি ফ্ল্যাটে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হারুন অর রশিদ ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

রাজধানীর ওয়ারীতে সামিয়াদের বাসায় আজ বুধবার সকালে কথা হয় তার বাবা আবদুস সালামের সঙ্গে। সামিয়ার মা সানজিদা আক্তারের চোখের পানি শুকিয়ে গেছে, তবে কিছুক্ষণ পরপর বুকচাপা আর্তনাদে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠছিল। আবদুস সালাম বললেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে সামিয়ার বয়স লেখা হচ্ছে ৭ বছর, কিন্তু তার বয়স ছিল ৬ বছর। দুই মেয়ে দুই ছেলের মধ্যে সামিয়া ছিল আবদুস সালাম ও সানজিদা আক্তার দম্পতির ছোট মেয়ে।

আবদুস সালাম জানালেন, মাত্র চার মাস আগে ওয়ারীতে নিজের এ ফ্ল্যাটে আসেন তাঁরা। তাঁরা ভবনের ষষ্ঠ তলায় থাকেন। আর সামিয়াকে যিনি ধর্ষণ করেন তিনি অষ্টম তলার ফ্ল্যাটমালিকের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। সামিয়ার লাশ পাওয়া যায় নবম তলার নির্মাণাধীন ফ্ল্যাটের রান্না ঘরে সিঙ্কের নিচে।

আবদুস সালাম ও সানজিদা আক্তার দম্পতির পুরো বাসায় সামিয়ার স্মৃতি। মেয়েটা বৃহস্পতিবার স্কুলে গিয়েছিল, স্কুল থেকে ফেরার পর স্কুল ড্রেস রাখা হয় দরজার পেছনে, সেখানেই ঝুলছে স্কুল ড্রেস ও টাই। স্কুল ব্যাগ থেকে খাতাগুলো বের করা হয়নি। স্কুলে যাওয়ার সময় সামিয়া সব সময় দড়ি লাফানোর দড়ি নিয়ে যেত। স্কুল ব্যাগে তাও আছে।

সানজিদা আক্তার যেদিকে হাত দেন সেদিকেই সামিয়ার স্মৃতি। নতুন ফুল তোলা কয়েকটি ফ্রক বের করে জানালেন, এই ফ্রকগুলো মেয়ে গায়েই দেয়নি। কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় পরবে বলে তুলে রাখা হয়েছিল। আর যে পুতুলটি মেয়ের সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল সেটাও তো ঘরেই আছে। শুধু মেয়েটাই হারিয়ে গেল, ছবি হয়ে গেল।

সানজিদা আক্তার বললেন, ‘মেয়েটি খুব চঞ্চল ছিল। সবার সঙ্গে একটু সময়েই খুব মিশে যেত। কখন কার সঙ্গে কোন দিকে চলে যায়, তা চিন্তা করতাম। স্কুলে দিয়েও বসে থাকতাম। সেই দিন ও যখন আটতলায় খেলতে যেতে চায়, না করিনি। এর আগেও ওইখানে সে খেলতে গেছে। এখন মনে হয় ক্যান মেয়েটারে যেতে দিলাম। মেয়ে গেলেও তার পিছু পিছু কেন গেলাম না। ওকে যখন নির্যাতন করে শ্বাসরোধ করে মারা হলো, তখন আমি ক্যান কিছু বুঝলাম না? আমার মেয়েকে বাঁচাতে পারি নাই, আমার মেয়ে কি আমাকে ক্ষমা করবে?’

সামিয়া রাতে সানজিদা আক্তারের হাতে ঘুমাত। হাত ব্যথা হয়ে গেলেও তাকে হাত থেকে নামানো যেত না। এখন সানজিদা আক্তার রাতে ঘুমাতে পারেন না। হাত খালি খালি লাগে। সানজিদা আক্তারের গলায় কান্নার বদলে ক্ষোভ জমতে থাকে। বললেন, ‘আমার মেয়েটারে শ্বাসরোধ করে মারছে। সবাই ধর্ষকের ফাঁসির কথা বলে। ওকে ফাঁসি দিলে আমার কী লাভ? আমার মেয়েটারেও তো ফাঁসি দিয়াই মারছে, তাইলে আর পার্থক্য কই থাকল? ধর্ষককে সবার সামনে এনে দাঁড় করানোর পর সবাই পাথর নিক্ষেপ করবে, সবার সামনে ও মরবে। তাইলে যদি আমার আত্মাটা একটু শান্তি পায়। আমার বুকের মধ্যে যে কষ্ট, তা তো কাউরে দেখাইতে পারি না।’

 

সানজিদা বলেন, ‘…আমি চাই আর কোনো সামিয়ার মায়ের বুক যাতে খালি না হয়। অপরাধীরা সামিয়াদের মারার আগে যেন দশবার ভাবে।’ সামিয়ার বাবা আবদুস সালাম দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার করে আসামির ফাঁসি চাইলেন, এর বিকল্প আর কিছু নেই বলে মন্তব্য করেন। বারবার উল্লেখ করলেন, দ্রুত এ শাস্তি কার্যকর হয়েছে তা তিনি দেখতে চান।

শুধু সামিয়ার মা-বাবা নন, সামিয়া যে ফ্ল্যাটে খেলতে গিয়েছিল সেই ফ্ল্যাটের মালিকের স্ত্রীও (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, ‘ওই পশু যে কাজ করছে, তারে ক্ষমা করার কোনো কারণ নাই। আমিও চাই ওর ফাঁসি হোক। নিজের মায়ের পেটের ভাইও যদি এই কাজ করত, আমি একই কথা বলতাম।’ এই নারী জানালেন, ঘটনার দিন সামিয়া তাঁর সাড়ে সাত মাস বয়সী সন্তানের সঙ্গে খেলতে এসেছিল। তবে সন্তানের অসুস্থতার জন্য সামিয়াকে বাসায় ফিরে যেতে বলেন। জানা গেল, এই পরিবারটিও তাঁদের ফ্ল্যাটে ওঠেন মাত্র দুই মাস আগে। এই সময়ের মধ্যে সামিয়া প্রায়ই এ ফ্ল্যাটে আসত খেলার জন্য।

সামিয়া বাসার কাছেই সিলভারডেল প্রিপারেটরি অ্যান্ড গার্লস হাইস্কুলে কেজিতে (কহিনূর শাখা) পড়ত। স্কুলের নামফলক ঢেকে আছে সামিয়ার শোকবার্তা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে তৈরি করা কালো ব্যানারে। স্কুলে উপস্থিত একাধিক অভিভাবক মায়েরা প্রথম আলোকে জানালেন, তাঁরা ঘটনাটি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। তাঁরা ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান। প্রকাশ্যে শাস্তি কার্যকর করার দাবিও তুললেন অভিভাবকেরা।

সিলভারডেল প্রিপারেটরি অ্যান্ড গার্লস হাইস্কুলের স্কুল শাখার প্রধান শিক্ষক সামা আফরোজ আসামির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করার পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতার বিষয়টিতেও গুরুত্ব দিলেন। তিনি বলেন, এ এলাকায় বেশির ভাগ ব্যবসায়ী বাবার ছেলেমেয়েরা পড়ছে। অনেক সময় দোকানের কর্মচারী বা অন্য কাউকে দিয়ে মেয়েকে স্কুলে পাঠিয়ে দেন অনেক অভিভাবক। আবার বাসায় থাকলেও মেয়ে কোন ফ্ল্যাটে যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, তা খেয়াল করেন না। অভিভাবকের সচেতনতায় হয়তো এ ধরনের ঘটনা কিছুটা কমতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আবদুস সালাম ও সানজিদা আক্তারের বাসায় কথা হলো বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির প্রকল্প কর্মকর্তা (লিগ্যাল) ফেরদৌস নিগারের সঙ্গে। সংগঠনের পক্ষ থেকে সব ধরনের আইনি সহায়তা দেওয়ার কথা জানানোর পাশাপাশি পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর জন্য তিনি সেখানে গিয়েছেন বলে জানালেন। তিনি ও বললেন, ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সংগঠনের পক্ষ থেকে তাঁরাও আইনি সহায়তা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। এই আইনজীবীর মতে, অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক সাজা কার্যকর করা সম্ভব হলে হয়তো ধর্ষণের এই মহামারি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হতে পারে।